চট্টগ্রাম এলএ শাখার আলী আযম কি আরেক জাবেদ আলী?

  • বউয়ের নামে কিনেছেন জমি, করেছেন বাড়ি
  • ব্যবহার করেন প্রিমিও গাড়ি
  • ভুমি অধিগ্রহণের চেকের কমিশনে গড়ে তোলেন অঢেল সম্পদ
  • অভিযোগের পরও নিরব জেলা প্রশাসক
চট্টগ্রাম এলএ শাখার আলী আযম কি আরেক জাবেদ আলী?
এইচ এম আলী আযম খানের অঢেল সম্পদ। ছবি : দৈনিক ঈশান
18px
Dainik Ishanঈশান/প্রবি/বেরি২৬ এপৃল, ২০২৬, ৩:৫২ PM

উয়ের নামে কিনেছেন জমি। যেখানে নির্মাণ করেছেন বিলাস বহুল ৭ তলা বাড়ি। ব্যবহার করেন প্রিমিও গাড়ি। এছাড়া আওয়ামী লীগ নেতা ভাইসহ পরিবারের সদস্যদের নামে চট্টগ্রাম মহানগর ও নিজ জন্মস্থান আনোয়ারায় কিনেছেন সারি সারি জমি। বিভিন্ন ব্যাংকে জমা রেখেছেন কাড়ি কাড়ি টাকা।

এসব কিছুই যেন মনে করিয়ে দেয় সেই স্বৈরাচারি শেখ হাসিনার আলোচিত দূর্নীতিবাজ ড্রাইভার জাবেদ আলীর অঢেল সম্পদের কথা। মনে করিয়ে দেয় এনবিআর কর্মকর্তা মতিউর রহমানের দূর্নীতির কথা। যাদের মতো অঢেল সম্পদের মালিক চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সাধারণ শাখার উপ-সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং ভুমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার প্রাক্তণ উচ্চমান সহকারি এইচ এম আলী আযম খান।

তার কথায় এসব সম্পদের হিসাব-নিকাশ চললেও যেন নিজের কিছুই নেই। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের শোলকাটা গ্রামের মৃত মোজাম্মেল হক চৌধুরীর ছেলে এইচ এম আলী আযম খান এতটাই চতুর যে, নিজের নামে কেনা অঢেল সম্পদের অনেকটাই আড়াল করে রেখেছেন।

ধন-সম্পদের শক্তিতে নিজ এলাকার মানুষকে মানুষ বলেও মনে করেননা তিনি। দখল করেছেন মানুষের জমি-পুকুরসহ নানা সম্পদ। পুলিশ দিয়ে হয়রানিসহ নানাভাবে করছেন জুলুম ও নির্যাতন। এমন একাধিক ভুক্তভোগীর সাথে কথা বলে তার অঢেল সম্পদের কিছু তথ্য সামনে আনা সম্ভব হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের একজন হলেন আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের শোলকাটা গ্রামের মো. আবদুল্লাহর ছেলে সমির উদ্দিন। তার প্রায় ১২ গন্ডা জায়গা জোরপূর্বক অবৈধভাবে দখল করে দেয়াল ও পিলার নির্মাণ করেছেন এইচ এম আলী আযম খান। এ নিয়ে তাকে প্রতিনিয়ত প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন তিনি। জেলা প্রশাসনের প্রভাব বিস্তার করায় তার সাথে কুলিয়ে উঠতে না পেরে সমির উদ্দিন অঢেল সম্পদের কিয়দাংশের বিবরণ দিয়ে দূর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের বরাবরে পৃথক অভিযোগ দায়ের করেন।

২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর দায়ের করা পৃথক অভিযোগে সমির উদ্দিন উল্লেখ করেন, এইচ এম আলী আযম খান বায়েজীদ থানার পূর্ব নাছিরাবাদ পলিটেকনিক মোজাফফর নগর আবাসিক এলাকার হাজী মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী সড়কে বিশাল জায়গায় ৭ তলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন।

বাড়িটির নাম ড্যাফোডিল ভবন। বর্তমানে জমিসহ এই বাড়ির বাজার মূল্যে ২০ কোটি টাকারও বেশি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এছাড়া তার রয়েছে ৩৭ লাখ ২৩ হাজার টাকা মূল্যের প্রিমিও কার। নম্বর চট্ট-মেট্রো-গ-১২-০৯০৮।

অভিযোগে দাবি করা হয়, কর্মস্থলে সাধারণ মানুষের ভুমি অধিগ্রহণ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া ঘুষের অবৈধ অর্থে পেশায় গৃহিনী স্ত্রী মোহছেনা আক্তারের নামে কেনা বিশাল এই জায়গায় ৭ তলা ড্যাফোডিল ভবন নির্মাণ করেন। এই ভবনের বিদ্যুতের মিটারও স্ত্রী মোহছেনার নামে। মিটারের নম্বর হচ্ছে ০১০৪১০০৯৫৯২০, ০১০৪১০০৯৪৮৪৮। বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ ভূমির ক্রয়কৃত মালিকানা ছাড়া বিদ্যুৎ মিটার প্রদান করেন না।

এভাবে তিনি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা আপন ভাইসহ পরিবারের সদস্যদের নামে জমি ও কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন। নগরীর বিভিন্ন ব্যাংকে স্বজনদের হিসাবে জমা রেখেছেন কাড়ি কাড়ি টাকা। দূর্নীতি আড়াল করতে তিনি এই উপায় অবলম্বন করেছেন। এর মধ্যেও তিনি নিজের নামে অনেক সম্পদ কিনেছেন। দূর্নীতি আড়াল করতে তিনি এসব গোপন রেখেছেন।

এমন একটি জমি কেনার তথ্য মিলেছে আনোয়ারা সাব রেজিষ্ট্রার অফিসে। অফিসের দলিলমুলে দেখা যায়, এইচ এম আলী আযম খান গত ২০১৮ সালের ১২ এপৃল ৫,২৩,২০,০০০/-(পাঁচ কোটি তেইশ লক্ষ বিশ হাজার) টাকা মূল্যে ১০ একর জমি কিনেছেন। জমির দলিল নং ১৬৫৩। যেখানে তিনি নিজেকে ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অথচ বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সাধারণ শাখায় উপ-সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

এর আগে ২০২০ সালের ১ অক্টোবর চট্টগ্রামের একটি আঞ্চলিক দৈনিক পত্রিকায় এইচ এম আলী আযম খানের দুর্নীতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। যার শিরোনাম ছিল 'কমিশন' চেক উড়ে এলএ শাখায়। এই প্রতিবেদনে বলা হয়, ভূমি অধিগ্রহণে ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত 'কমিশন' নেওয়া হয়। আর অধিগ্রহণের চেক গ্রহণের আগেই কমিশনের চেক প্রদান করতে হয়।

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপি ও নেতাদের সাথে আলী আযম খান। ছবি : দৈনিক ঈশান

অনিয়মের এই চক্রে জড়িত সার্ভেয়ার কানুনগো, অফিস সহকারী, অধিগ্রহণ কর্মকর্তা, ব্যাংক ও হিসাবরক্ষণ অফিসের কর্মকর্তা ছাড়াও ডজনখানেক সাংবাদিক রয়েছে। রয়েছে অর্ধশতাধিক দালালচক্র। যার মধ্যে নজরুল নামে এক চেইনম্যানকে গ্রেপ্তার করে দুদক। ওই সময় তার কাছ থেকে ৫৮ লাখ টাকাসহ কয়েকটি চেক উদ্ধার করে দুদক কর্মকর্তারা। আর এই দূর্নীতির মূল হোতা ছিলেন এইচ এম আলী আযম খান। তিনি তখন এলএ শাখার উচ্চমান সহকারী ছিলেন।

অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রামে অন্তত সরকারের ১৩১টি প্রকল্প থেকে ভুমি অধিগ্রহণে হাজার হাজার ভুমির মালিক থেকে ১০-১৫% কমিশনে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন এইচ এম আলী আযম খান। যা এখনো চলমান। ভাগবোটায়ারায় তুষ্ট জেলা প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নেক নজরে ফ্যাসিবাদের দোসর এইচ এম আলী আযম খান পদোন্নতি পেয়ে বসে যান ১০ম গ্রেডে উপ-সহকারী প্রশাসনকি কর্মকর্তা হিসেবেও।

এরপর তার দূর্নীতির গতি আরও বেড়ে যায়। শুধু তাই নয়, তার বিরুদ্ধে একাধিক লিখিত অভিযোগ দায়ের করলেও কোন ব্যবস্থা নেয়নি জেলা প্রশাসন। তবে বিষয়টি তদন্ত করতে দূর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি গত এপৃল আনোয়ারায় আলী আযম খানের গ্রামের বাড়ি পরিদর্শন করেন। চট্টগ্রাম মহানগরসহ তার সম্পদের খোঁজে সক্রিয় রয়েছে দুদক টিম।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এইচ এম আলী আযম খান জেলা প্রশাসনে শক্ত সিন্ডিকেট গড়ে তোলেছেন। তার মাথার ওপর আশীর্বাদের হাত রয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের দূর্নীতিবাজ সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. ইউনুচের। যার মাধ্যমে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এলএ পর্যন্ত পৌছে যায় ভুমি অধিগ্রহণের ভাগ-বাটোয়ারার অর্থ। এর সত্যতা মিলেছে জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তার মুখে।

এইচ এম আলী আযম খান সম্পর্কে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, এইচ এম আলী আযম খান তো আপাদমস্তক একজন দূর্নীতিবাজ। জেলা প্রশাসনের এলএ শাখা সম্পূর্ণ তার কথা মতো চলে। তার এখন যে সম্পদ রয়েছে তার কানাকড়িও জেলা প্রশাসনের অনেক এডিসি-ডিসিরও নেই।

জেলা প্রশাসনের সংস্থাপন শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবুদুর রহিম বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, তার এত সম্পদ কল্পনা করা যায় না। অবসরপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. ইউনুচ তো এইচ এম আলী আযম খানের প্রিয় মানুষ। দু‘জনের বাড়িও এক এলাকায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এইচ এম আলী আযম খান মুঠোফোনে বলেন, আমার কোন জমি ও ভবন নেই। আরেকজনের ভবনের ছবি এনে আমার বললে তো হবে না। আর আমার নিজস্ব কোন গাড়িও নেই। আরেকজনের গাড়িতে চড়ি। গাড়িটি আমার আত্নীয়ের। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ভাই এসব বিষয়ে কথা বলতে আমার ভাল লাগছে না। অন্য বিষয়ে কথা বললে আপনার সাথে আমার বন্ধুত্ব হতে পারে।

সমির নামে এক প্রতিবেশিকে এসব অভিযোগের জন্য দায়ী করে তিনি বলেন, তার সাথে জায়গা-জমি নিয়ে আমার ঝামেলা আছে। এ কারণে গত ৭-৮ বছর ধরে সে এসব করছে। এ কারণে তাকে আমি থানায়ও দিয়েছি। জেলও খেটেছে। এসব কাজ আর না করার জন্য মুচলেকাও দিয়েছে। এরপর কিছুদিন সে নিরব ছিল, এখন আবার শুরু করেছে।

অন্য আরেক প্রশ্ন করা হলে এইচ এম আলী আযম খান বলেন, ভাই এখন আমি ব্যস্ত আছি, আপনার সাথে পরে কথা বলব বলে নিজেই ফোনের সংযোগ কেটে দেন তিনি। কিন্তু পরে তিনি আর কোন ফোনকল রিসিভ করেননি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভুমি অধিগ্রহণ শাখার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক কামরুজ্জামানের মুঠোফোনে কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। ব্যস্ততা দেখিয়ে তিনি একটি টেক্সট মেসেজে জানান, তিনি নিজেই ফোন করে কথা বলবেন। কিন্তু তিনি ফোন আর করেননি। ফলে কথা বলতে রবিবার দুপুরে দপ্তরে গেলেও তিনি ছিলেন না।

তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত না। এমন কোন অভিযোগ আমার কাছে আসেনি। আমি আসার পর কোন অভিযোগ থাকলে বলেন। বিষয়টির খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

ঈশান/প্রবি/বেরি

মন্তব্য করুন